ভস্ম থেকে ‘জোড়া ডানা’য় উড়লেন রোনালদো

পতুর্গাল ৫ : ০ উজবেকিস্তান

‘রোনালদোর সাফল্যের ক্ষুধা তাঁকে দিয়ে শুরু, তাঁকে দিয়ে শেষ’—গড ইজ রাউন্ড বইয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সম্পর্কে এই কথাটা লিখেছিলেন মেক্সিকান লেখক হুয়ান ভিলোরো। সাফল্যের জন্য ক্ষুধার্ত সেই মানুষটিই গত কয়েক দিন ট্রলের শিকার হচ্ছিলেন। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের জিততে না পারার সব দায় দেওয়া হলো তাঁর কাঁধে। ফুটবল বোদ্ধা থেকে সাধারণ দর্শক কেউ ন্যূনতম ছাড় দিলেন না।

৪১ পেরোনো রোনালদোর নামের পাশে বসিয়ে দেওয়া হলো ‘দলের বোঝা’ ট্যাগও। এমন পরিস্থিতিতে কোণঠাসা রোনালদো সর্বোচ্চ যা করতে পারতেন, তা–ই করেছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ভস্ম থেকে রোনালদো জাগলেন ফিনিক্সের মতো। গতকাল রাতে হিউস্টনে পর্তুগালের ৫-০ গোলের জয়ে রোনালদো করলেন জোড়া গোল। জানিয়ে দিলেন, তাঁর কাঁধ এখনো যেমন সব দায়ের ভার বহন করতে পারে, তেমনি সেসব দায় মুহূর্তের মধ্যে নামিয়েও ফেলতে পারে।

.

ক্যারিয়ারে ৯৭৫ গোল তো আর হাওয়ায় ভেসে আসেনি! এরপরও গতকাল রাতের জোড়া গোলের আবেগটা একটু ভিন্ন। বিশেষ করে প্রথম গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর উদ্‌যাপনই বলে দিচ্ছিল সবকিছু। প্রতিটি অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল, গোলের জন্য তিনি কতটা তেতে ছিলেন।

.মাঠে নামছে পর্তুগাল, কেমন করবেন রোনালদো ? .

রোনালদোর এই ২ গোল শুধু প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানো নয়। এই ২ গোল অসংখ্য প্রশ্নের উত্তরও। একাধিক রেকর্ড ভাঙার পাশাপাশি রোনালদো বুঝিয়ে দিলেন তাঁর অভিধানে ‘ফুরিয়ে যাওয়া’ বলে কোনো কথা নেই। যখন সবাই তাঁর সমাপ্তির এপিটাফ লিখতে বসেছিল, তখনই তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন প্রতি–উত্তরের। একেকটি গোল, শট এবং প্রচেষ্টায় বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন, কেন তাঁর নামের পাশে ৫টি ব্যালন ডি’অর।

.

হিউস্টনে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে রোনালদো প্রথম গোলটি করেন ম্যাচের ৬ মিনিটে। ডান পাশ থেকে জোয়াও কানসেলোর বাড়ানো বল ধরে গোলটি ‘সিআর সেভেন’ পেয়েছেন ট্রেডমার্ক ফিনিশিংয়ে। পর্তুগালের জার্সিতে ১৪৪তম গোলে ইতিহাসেও নাম লেখান রোনালদো। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ভিন্ন ছয়টি বিশ্বকাপে গোল পেলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি।

.‘শুধু রোনালদো নয়, আমরাও কাঠগড়ায় আছি’.

১৭ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে নুনো মেন্দেসের করা গোলটির কৃতিত্ব কেউ চাইলে রোনালদোকেও দিতে পারেন। উজবেকিস্তান এই গোলটি হজম করেছে স্রেফ রোনালদোর নামের কারণে। রোনালদো যেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা ভাবতেই পারেনি অন্য কেউ এই শটটি নিতে পারেন।

কিন্তু ‘দলের জন্য না ভাবা’ রোনালদোই দলের কথা ভেবেই ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তাঁর দিকে তাকিয়ে বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে উজবেক খেলোয়াড়েরা। আর এই ফাঁকে গোলটি করলেন মেন্দেস। এরপর ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাসে তৃতীয় গোলটি এল রোনালদোর দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে। যে গোলে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে তিনি ছাড়ালেন কিংবদন্তি ইউসেবিওর করা রেকর্ড ৯ গোলকে। বিশ্বকাপে রোনালদোর গোল এখন ১০।

.

এই জোড়া গোলে মেসির আরও একটি রেকর্ডকে পেছনে ফেলেন রোনালদো। গোল দুটি করার সময় রোনালদোর বয়স ৪১ বছর ১৩৮ দিন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে জোড়া গোল করার রেকর্ড এখন তাঁরই। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের ম্যাচে মেসির বয়স ছিল ৩৮ বছর ৩৬৩ দিন। এরপর চতুর্থ গোল পর্তুগাল পেল উজবেক গোলরক্ষক আবদুভোহিদ নেমাতভের আত্মঘাতী উপহার হিসেবে আর পঞ্চম গোলটি করলেন রাফায়েল লিয়াও। এই ম্যাচে রেকর্ডের পাশাপাশি হ্যাটট্রিকও পেতে পারতেন রোনালদো। কিন্তু একাধিকবার কাছাকাছি গিয়েও পারেননি।

.

রোনালদোকে অবশ্য এই সব গোল, হ্যাটট্রিক কিংবা রেকর্ডে সামান্যই বাঁধা যাবে। প্রকৃতির সব নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি আজকের রোনালদো। হয়েছেন মানুষের মধ্যেও অনন্য একজন। মানুষের মানবীয় সামর্থ্য যেখানে ফুরোয়, সেখান থেকেই যেন শুরু হয় রোনালদোর পথচলা।

তাই সব লেনদেন শেষ হয়ে গেলে ঝরে পড়ার আগে বিশ্বকাপে নিজের শেষ আসরে শত নক্ষত্রের আলোয় রোনালদোর আরেকবার জ্বলে ওঠাটা যেন আজ ভোরে সূর্য ওঠার মতো সত্য। এমনটা শুধু তিনিই পারেন, কারণ তিনি রোনালদো। সাফল্যের জন্য যাঁর তৃষ্ণা তাঁকে দিয়ে শুরু, তাঁকে দিয়েই শেষ।

Comments

Comments (0)

Leave a comment

Comments are reviewed before they appear publicly.

No comments yet. Be the first to share your opinion.